Pages

Pages

বাংলা শব্দ দিয়ে সার্চ করুন

Friday, May 5, 2017

স্রষ্টা ভালো কাজের বেলায় প্রশংসা নেন, খারাপ কাজের দায় কেনো নেন না?


প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ

আরিফ আজাদ


স্রষ্টা ভালো কাজের বেলায় প্রশংসা নেন, খারাপ কাজের দায় কেনো নেন না?

ক্লাশে নতুন একজন স্যার এসেছেন।নাম- মফিজুর রহমান।

হ্যাংলা-পাতলা গড়ন।বাতাস আসলেই যেনো ঢলে পড়বে মতন অবস্থা শরীরের।ভদ্রলোকের চেহারার চেয়ে চোখ দুটি অস্বাভাবিক রকম বড়।দেখলেই মনে হয় যেন বড় বড় সাইজের দুটি জলপাই, কেউ খোদাই করে বসিয়ে দিয়েছে।

ভদ্রলোক খুবই ভালো মানুষ।উনার সমস্যা একটিই- ক্লাসে উনি যতোটা না বায়োলজি পড়ান, তারচেয়ে বেশি দর্শন চর্চা করেন।ধর্ম কোথা থেকে আসলো, ঠিক কবে থেকে মানুষ ধার্মিক হওয়া শুরু করলো, 'ধর্ম আদতে কি' আর, 'কি নয়' তার গল্প করেন।

-

আজকে উনার চতুর্থ ক্লাশ। পড়াবেন Analytical techniques & bio-informatics। চতুর্থ সেমিষ্টারে এটা পড়ানো হয়।

স্যার এসে প্রথমে বললেন,- 'Good morning, guys....'

সবাই সমস্বরে বললো,- 'Good morning, sir...'

এরপর স্যার জিজ্ঞেস করলেন,- 'সবাই কেমন আছো? '

স্যারের আরো একটি ভালো দিক হলো- উনি ক্লাশে এলে এভাবেই সবার কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন।সাধারণত হায়ার লেভেলে যেটা সব শিক্ষক করেন না। তারা রোবটের মতো ক্লাশে আসেন,যন্ত্রের মতো করে লেকচারটা পড়িয়ে বেরিয়ে যান।সেদিক থেকে মফিজুর রহমান নামের এই ভদ্রলোক অনেকটা অন্যরকম।

আবারো সবাই সমস্বরে উত্তর দিলো।কিন্তু গোলমাল বাঁধলো এক জায়গায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন উত্তর দিয়েছে এভাবে- 'আলহামমমমদুলিল্লাহ ভালো।'

স্যার কপালের ভাঁজ একটু দীর্ঘ করে বললেন,- 'আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো বলেছো কে কে?'

অদ্ভুত প্রশ্ন। সবাই থতমত খেলো।

একটু আগেই বলেছি স্যার একটু অন্যরকম। প্রাইমারি লেভেলের টিচারদের মতো ক্লাশে এসে বিকট চিৎকার করে Good Morning বলেন, সবাই কেমন আছে জানতে চান।এখন 'আলহামদুলিল্লাহ্‌' বলার জন্য কি প্রাইমারি লেভেলের শিক্ষকদের মতো বেত দিয়ে পিটাবেন নাকি?

সাজিদের তখন তার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বাবুল চন্দ্র দাশের কথা মনে পড়ে গেলো।এই লোকটা ক্লাশে কেউ দুটোর বেশি হাঁচি দিলেই বেত দিয়ে আচ্ছামতন পিটাতেন। উনার কথা হলো- 'হাঁচির সর্বোচ্চ পরিমাণ হবে দু'টি। দু'টির বেশি হাঁচি দেওয়া মানে ইচ্ছে করেই বেয়াদবি করা।'

যাহোক, বাবুল চন্দ্রের পাঠ তো কবেই চুকেছে, এবার মফিজ চন্দ্রের হাতেই না গণ পিটুনি খাওয়া লাগে।

ক্লাশের সর্বমোট সাতজন দাঁড়ালো। এরা সবাই 'আলহামদুলিল্লাহ্‌ ভালো' বলেছে। এরা হচ্ছে- রাকিব, আদনান, জুনায়েদ, সাকিব, মরিয়ম,রিতা এবং সাজিদ।

স্যার সবার চেহারাটা একটু ভালোমতো পরখ করে নিলেন। এরপর পিক করে হেসে দিয়ে বললেন,- 'বসো।'

সবাই বসলো। আজকে আর মনে হয় এ্যাকাডেমিক পড়াশুনা হবেনা। দর্শনের তাত্বিক আলাপ হবে।

ঠিক তাই হলো। মফিজুর রহমান স্যার আদনানকে দাঁড় করালো। বললেন,- 'তুমিও বলেছিলে সেটা, না?'

- 'জ্বি স্যার।'- আদনান উত্তর দিলো।

স্যার বললেন,- 'আলহামদুলিল্লাহ্‌'র অর্থ কি জানো?'

আদনান মনে হয় একটু ভয় পাচ্ছে। সে ঢোঁক গিলতে গিলতে বললো,- 'জ্বি স্যার, আলহামদুলিল্লাহ্‌ অর্থ হলো- সকল প্রশংসা কেবলি আল্লাহর।'

স্যার বললেন,- ' সকল প্রশংসা কেবলি আল্লাহর।'

স্যার এই বাক্যটি দু'বার উচ্চারণ করলেন।এরপর আদনানের দিকে তাকিয়ে বললেন,- 'বসো।'

আদনান বসলো। এবার স্যার রিতাকে দাঁড় করালেন। স্যার রিতার কাছে জিজ্ঞেস করলেন,- 'আচ্ছা, পৃথিবীতে চুরি-ডাকাতি আছে?'

রিতা বললো,- 'আছে।'

- 'খুন-খারাবি, রাহাজানি, ধর্ষণ?'

-- 'জ্বি,আছে।'

- 'কথা দিয়ে কথা না রাখা, মানুষকে ঠকানো,লোভ-লালসা এসব?'

- 'জ্বি, আছে।'

- 'এগুলো কি প্রশংসাযোগ্য?'

- 'না।'

'তাহলে মানুষ একটি ভালো কাজ করার পর তার সব প্রশংসা যদি আল্লাহর হয়, মানুষ যখন চুরি-ডাকাতি করে, লোক ঠকায়, খুন-খারাবি করে,ধর্ষণ করে, তখন সব মন্দের ক্রেডিট আল্লাহকে দেওয়া হয়না কেনো? উনি প্রশংসার ভাগ পাবেন, কিন্তু দূর্নামের ভাগ নিবেন না, তা কেমন হয়ে গেলো না?'

রিতা মাথা নিঁচু করে চুপ করে আছে।স্যার বললেন,- 'এখানেই ধর্মের ভেল্কিবাজি। ইশ্বর সব ভালোটা বুঝেন, কিন্তু মন্দটা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। আদতে, ইশ্বর বলে কেউ নেই।যদি থাকতো, তাহলে তিনি এরকম একচোখা হতেন না। বান্দার ভালো কাজের ক্রেডিটটা নিজে নিয়ে নিবেন, কিন্তু বান্দার মন্দ কাজের বেলায় বলবেন- 'উহু, অইটা থেকে আমি পবিত্র। অইটা তোমার ভাগ।'

স্যারের কথা শুনে ক্লাশে যে ক'জন নাস্তিক আছে, তারা হাত তালি দেওয়া শুরু করলো। সাজিদের পাশে যে নাস্তিকটা বসেছে, সে তো বলেই বসলো,- 'মফিজ স্যার হলেন আমাদের বাঙলার প্লেটো।'

স্যার বলেই যাচ্ছেন ধর্ম আর স্রষ্টার অসারতা নিয়ে।

-

এবার সাজিদ দাঁড়ালো। স্যারের কথার মাঝে সে বললো,- 'স্যার, সৃষ্টিকর্তা একচোখা নন। তিনি মানুষের ভালো কাজের ক্রেডিট নেন না। তিনি ততোটুকুই নেন, যতোটুকু তিনি পাবেন।ইশ্বর আছেন।'

স্যার সাজিদের দিকে একটু ভালোমতো তাকালেন।বললেন,- 'শিওর?'

- 'জ্বি।'

- 'তাহলে মানুষের মন্দ কাজের জন্য কে দায়ী?'

- 'মানুষই দায়ী।- সাজিদ বললো।

- 'ভালো কাজের জন্য?'

- 'তাও মানুষ।'

স্যার এবার চিৎকার করে বললেন,- 'এক্সাক্টলি, এটাই বলতে চাচ্ছি। ভালো/মন্দ এসব মানুষেরই কাজ।সো, এর সব ক্রেডিটই মানুষের।এখানে স্রষ্টার কোন হাত নেই। সো, তিনি এখান থেকে না প্রশংসা পেতে পারেন, না তিরস্কার।সোজা কথায়, স্রষ্টা বলতে কেউই নেই।'

ক্লাশে পিনপতন নিরবতা। সাজিদ বললো,- 'মানুষের ভালো কাজের জন্য স্রষ্টা অবশ্যই প্রশংসা পাবেন, কারন, মানুষকে স্রষ্টা ভালো কাজ করার জন্য দুটি হাত দিয়েছেন, ভালো জিনিস দেখার জন্য দুটি চোখ দিয়েছেন, চিন্তা করার জন্য মস্তিষ্ক দিয়েছেন, দুটি পা দিয়েছেন। এসবকিছুই স্রষ্টার দান।তাই ভালো কাজের জন্য তিনি অবশ্যই প্রশংসা পাবেন।'

স্যার বললেন,- 'এই গুলো দিয়ে তো মানুষ খারাপ কাজও করে, তখন?'

- 'এর দায় স্রষ্টার নয়।'

- 'হা হা হা হা। তুমি খুব মজার মানুষ দেখছি।হা হা হা হা।'

সাজিদ বললো,- 'স্যার, স্রষ্টা মানুষকে একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন।এটা দিয়ে সে নিজেই নিজের কাজ ঠিক করে নেয়। সে কি ভালো করবে, না মন্দ।'

স্যার তিরস্কারের সুরে বললেন, - 'ধর্মীয় কিতাবাদির কথা বাদ দাও,ম্যান। কাম টু দ্য পয়েণ্ট এন্ড বি লজিক্যাল।'

সাজিদ বললো, - 'স্যার, আমি কি উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে পারি ব্যাপারটা?'

- 'অবশ্যই।'- স্যার বললেন।

সাজিদ বলতে শুরু করলো-

'ধরুন, খুব গভীর সাগরে একটি জাহাজ ডুবে গেলো। ধরুন, সেটা বার্মুডা ট্রায়াঙ্গাল। এখন কোন ডুবুরিই সেখানে ডুব দিয়ে জাহাজের মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে পারছে না।বার্মুডা ট্রায়াঙ্গালে তো নয়ই। এই মূহুর্তে ধরুন সেখানে আপনার আবির্ভাব ঘটলো। আপনি সবাইকে বললেন,- 'আমি এমন একটি যন্ত্র বানিয়ে দিতে পারি, যেটা গায়ে লাগিয়ে যেকোন মানুষ খুব সহজেই ডুবে যাওয়া জাহাজের মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে পারবে।ডুবুরির কোনরকম ক্ষতি হবে না।'

স্যার বললেন,- 'হুম, তো?'

- 'ধরুন, আপনি যন্ত্রটি তৎক্ষণাৎ বানালেন, এবং একজন ডুবুরি সেই যন্ত্র গায়ে লাগিয়ে সাগরে নেমে পড়লো ডুবে যাওয়া মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে।'

ক্লাশে তখন একদম পিনপতন নিরবতা। সবাই মুগ্ধ শ্রোতা।কারো চোখের পলকই যেনো পড়ছেনা।

সাজিদ বলে যেতে লাগলো-

'ধরুন, ডুবুরিটা ডুব দিয়ে ডুবে যাওয়া জাহাজে চলে গেলো। সেখানে গিয়ে সে দেখলো, মানুষগুলো হাঁসপাশ করছে।সে একে একে সবাইকে একটি করে অক্সিজেনের সিলিন্ডার দিয়ে দিলো। এবং তাদের একজন একজন করে উদ্ধার করতে লাগলো।'

স্যার বললেন,- 'হুম।'

- 'ধরুন, সব যাত্রীকে উদ্ধার করা শেষ।বাকি আছে মাত্র একজন। ডুবুরিটা যখন শেষ লোকটাকে উদ্ধার করতে গেলো, তখন ডুবুরিটা দেখলো- এই লোকটাকে সে আগে থেকেই চিনে।'

এতটুকু বলে সাজিদ স্যারের কাছে প্রশ্ন করলো,- 'স্যার, এরকম কি হতে পারেনা?'

স্যার বললেন,- 'অবশ্যই হতে পারে। লোকটা ডুবুরির আত্মীয় বা পরিচিত হয়ে যেতেই পারে। অস্বাভাবিক কিছু নয়।'

সাজিদ বললো,- 'জ্বি। ডুবুরিটা লোকটাকে চিনতে পারলো। সে দেখলো,- এটা হচ্ছে তার চরম শত্রু।এই লোকের সাথে তার দীর্ঘ দিনের বিরোধ চলছে।এরকম হতে পারেনা,স্যার?

- 'হ্যাঁ, হতে পারে।'

সাজিদ বললো,- 'ধরুন, ডুবুরির মধ্যে ব্যক্তিগত হিংসাবোধ জেগে উঠলো।সে শত্রুতাবশঃত ঠিক করলো যে, এই লোকটাকে সে বাঁচাবেনা। কারন, লোকটা তার দীর্ঘদিনের শত্রু। সে একটা চরম সুযোগ পেলো এবং প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে উঠলো। ধরুন, ডুবুরি অই লোকটাকে অক্সিজেনের সিলিন্ডার তো দিলোই না, উল্টো উঠে আসার সময় লোকটাকে পেটে একটা জোরে লাথি দিয়ে আসলো।'

ক্লাশে তখনও পিনপতন নিরবতা। সবাই সাজিদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

স্যার বললেন,- 'তো, তাতে কি প্রমান হয়,সাজিদ?'

সাজিদ স্যারের দিকে ফিরলো। ফিরে বললো,- 'Let me finish my beloved sir....'

- 'Okey, you are permitted. carry on'- স্যার বললেন।

সাজিদ এবার স্যারকে প্রশ্ন করলো,- 'স্যার, বলুন তো, এই যে, এতগুলো ডুবে যাওয়া লোককে ডুবুরিটা উদ্ধার করে আনলো, এর জন্য আপনি কি কোন ক্রেডিট পাবেন?'

স্যার বললেন,- 'অবশ্যই আমি ক্রেডিট পাবো। কারন, আমি যদি অই বিশেষ যন্ত্রটি না বানিয়ে দিতাম, তাহলে তো এই লোকগুলোর কেউই বাঁচতো না।'

সাজিদ বললো,- 'একদম ঠিক স্যার। আপনি অবশ্যই এরজন্য ক্রেডিট পাবেন।কিন্তু, আমার পরবর্তী প্রশ্ন হচ্ছে- 'ডুবুরিটা সবাইকে উদ্ধার করলেও, একজন লোককে সে শত্রুতা বশঃত উদ্ধার না করে মৃত্যুকূপে ফেলে রেখে এসেছে। আসার সময় তার পেটে একটি জোরে লাথিও দিয়ে এসেছে। ঠিক?'

- 'হুম।'

- 'এখন স্যার, ডুবুরির এহেন অন্যায়ের জন্য কি আপনি দায়ী হবেন? ডুবুরির এই অন্যায়ের ভাগটা কি সমানভাবে আপনিও ভাগ করে নেবেন?'

স্যার বললেন,- 'অবশ্যই না। ওর দোষের ভাগ আমি কেনো নেবো? আমি তো তাকে এরকম অন্যায় কাজ করতে বলিনি।সেটা সে নিজে করেছে।সুতরাং, এর পুরো দায় তার।'

সাজিদ এবার হাসলো। হেসে সে বললো,- 'স্যার, ঠিক একইভাবে, আল্লাহ তা'য়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন ভালো কাজ করার জন্য। আপনি যেরকম ডুবুরিকে একটা বিশেষ যন্ত্র বানিয়ে দিয়েছেন, সেরকম সৃষ্টিকর্তাও মানুষকে অনুগ্রহ করে হাত,পা,চোখ,নাক,কান,মুখ,মস্তিষ্ক এসব দিয়ে দিয়েছেন। সাথে দিয়েছেন একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি।এখন এসব ব্যবহার করে সে যদি কোন ভালো কাজ করে, তার ক্রেডিট স্রষ্টাও পাবেন, যেরকম বিশেষ যন্ত্রটি বানিয়ে আপনি ক্রেডিট পাচ্ছেন।আবার, সে যদি এগুলো ব্যবহার করে কোন খারাপ কাজ করে, গর্হিত কাজ করে, তাহলে এর দায়ভার স্রষ্টা নেবেন না।যেরকম, ডুবুরির অই অন্যায়ের দায় আপনার উপর বর্তায় না। আমি কি বোঝাতে পেরেছি,স্যার?'

ক্লাশে এতক্ষণ ধরে পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছিলো। এবার ক্লাশের সকল আস্তিকেরা মিলে একসাথে জোরে জোরে হাত তালি দেওয়া শুরু করলো।

স্যারের জবাবের আশায় সাজিদ স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। স্যার বললেন,- 'হুম। আই গট দ্য পয়েণ্ট।'- এই বলে স্যার সেদিনের মতো ক্লাশ শেষ করে চলে যান।
0

Wednesday, May 3, 2017

স্বাস্থ্যরক্ষা ও চিকিৎসাবিজ্ঞান : ইসলাম ও বিজ্ঞানের আলোকে


প্রথমেই জানা যাক,স্বাস্থ্য বলতে কি বুঝায়............

“Health is a state of complete physical, mental, social and spiritual wellbeing and not merely an absence of disease or infirmity, so that each citizen can lead a socially and economically productive life.”------WHO’s definition (1948)

স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। আমাদের সকল কর্মকান্ডের মূল উদ্দেশ্যই আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা।। সেই ১৪০০ বছর আগ থেকেই ইসলাম আমাদেরকে প্রতিটি পদে পদে দিক নির্দেশনা দিয়ে আসছে।

আল্লাহ পাক বলেন ‘‘তোমাদের জন্য মুহাম্মদ (সঃ) এর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। তোমরা সেই শান্তির নিকেতন কে অনুস্মরণ কর! (আল কোরআন)

"স্বচ্ছলতা ও স্বাস্থ্য এ দুটি মহাদানের মূল্য প্রায় লোকই হৃদয়ঙ্গম করতে পারে না ---- "আল হাদিস

সুস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কি দরকার?? সঠিক আহার-পানীয়্, পর্যাপ্ত নিদ্রা আর পরিশ্রম। দেখা যাক এই সব ক্ষেত্রে ইসলাম কি বলে এবং তার বৈজ্ঞানিক সমর্থনই বা কি………

আহারঃ

আহারের ক্ষেত্রে প্রথম এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল হালাল খাবার।।

"আল্লাহ তা’য়ালা যেসব বস্তু তোমাদেরকে দিয়েছেন, তন্মধ্য থেকে হালাল ও পবিত্র বস্তু খাও এবং আল্লাহকে ভয় কর, যার প্রতি তোমরা বিশ্বাসী। "(Al-Maaida: 88)

"হে মানব মন্ডলী, পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু-সামগ্রী ভক্ষন কর। আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে নিঃসন্দেহে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।" (Al-Baqara: 168)

"অতএব, আল্লাহ তোমাদেরকে যেসব হালাল ও পবিত্র বস্তু দিয়েছেন, তা তোমরা আহার কর এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর যদি তোমরা তাঁরই ইবাদতকারী হয়ে থাক। "(An-Nahl: 114)


রাসুলে করিম (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা উদর পূর্তি করে ভোজন করো না, কেননা এতে তোমাদের অন্তরে আল্লাহ পাকের আলো নিষ্প্রভ হয়ে যাবে।’

খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সুন্নাত অত্যন্ত স্বাস্থ্যসম্মত। অতিভোজন তিনি পছন্দ করতেন না। অতিভোজন স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। এখন চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, অতিভোজনের ফলে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্ট্রোক ,প্যারালাইসিস,ইত্যাদি হতে পারে।
ইসলামের দিকনির্দেশনা হচ্ছে, যখন ক্ষুধা পাবে কেবল তখনই খাদ্য গ্রহণ করবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমরা এমন একটি সম্প্রদায় যারা খাওয়ার প্রয়োজন ব্যতীত খাদ্য গ্রহণ করি না। আর যখনই আমরা খাদ্য গ্রহণ করি তৃপ্তির সঙ্গে (উদরপূর্তি করে) ভক্ষণ করি না।’


নবী করীম (সা) পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খাবার দিয়ে এবং এক-তৃতীয়াংশ পানি দিয়ে পূর্ণ করতে বলেছেন। বাকি এক-তৃতীয়াংশ খালি রাখতে বলেছেন। (ইবনে মাজাহ)

হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা ডান হাতে ভক্ষণ কর।’ (মুসলিম শরীফ, হাদীস-৩৭৬৬)

নবী করীম (সা) দুধ ও মাছ একত্রে খেতে নিষেধ করেছেন,কেননা এর দ্বারা ক্ষতি সাধনের যথেষ্ট আশংকা রয়েছে।(যাদুল মায়াদ)

তিন আঙুলে ভক্ষণ করা, আঙুল চেটে খাওয়া (সুনানে কুবরা লিল-বায়হাকী) দস্তরখানায় ভক্ষণ করা, খাদ্য গ্রহণের পূর্বে ‘বিসমিল্লাহি ওয়া আলা বারাকাতিল্লাহ’ বলা ইসলামী আদর্শ-সুন্নাত।


পানীয়ঃ

মুসলিম শরীফেই ছয়টির বেশি সহীহ হাদীস আছে যেখানে মুসলমানদেরকে দাড়িয়ে পান করতে নিষেধ করা হয়েছে। তাহলো

“রসূল (সঃ) দাড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন।” (মুসলিম, ৫০১৭)

“মহানবী (সঃ) কোনো ব্যক্তিকে দাড়িয়ে পান করতে নিষেধ করেছেন।” (মুসলিম হাদীস নং)

“নবী করীম (সঃ) দাড়িয়ে পান করা সতর্ক করে দিয়েছেন।” (মুসলিম, ৫০২০)

“কেউ দাড়িয়ে পান করবে না।” (মুসলিম, ৫০২২)

"If the standing water drinker, knew the damage her stomach, vomit drinking water to the outside, no doubt" (Abdurrezzak 10/427 19 588 hadith).

সুতরাং এ সকল হাদীসগুলো দাড়িয়ে পান করাকে অনুমোদন দিচ্ছে না।

দাড়িয়ে পান করার কুফলঃ
১। হ্মতিগ্রস্ত হয়।(stomach damage)
২।স্নায়ুতন্ত্র হ্মতিগ্রস্ত হয়।(vagal inhibition)
৩।কিডনী হ্মতিগ্রস্ত হয়।(due to unequal distribution of water to whole kidney of both side)


"When one of you drink slowly drink of water, drink it in a breath. After all, a breath, drink water, inflammation of the liver (and breathing obstruction) constitute " the stated (Adürrezzak 10/428 19 594 Hadith).


রাসূলুল্লাহ সা. পানির মধ্যে নিঃশ্বাস ফেলতে এবং তার মধ্যে ফুঁক দিতে নিষেধ করেছেন। (মুস্তাদরাকে হাকিম)

এ ক্ষেত্রে বর্তমান বিজ্ঞানীরা তাদের দীর্ঘ গবেষণার ফসল হিসেবে যা বর্ণনা করেছেন, তা প্রিয়নবী সা.-এর উপরোক্ত হাদীসের ব্যাখ্যা মাত্র। পানি বিশেষজ্ঞ বা পানি বিজ্ঞানীদের মতে প্রাণীর নিঃশ্বাস ও ফুঁকের সাথে কার্বনডাই অক্সাইড বের হয় আর এ কার্বনডাই অক্সাইড যখন পানির সাথে গিয়ে মিশ্রিত হয় তখন তা থেকে কার্বলিক এসিড তৈরী হয়। আজ থেকে চৌদ্দ শতাধিক বছর পূর্বে নবীজী সা.-এর এ জাতীয় রাসায়নিক তথ্যাদি আজকের রসায়নদিবদেরকেও হতভম্ব করে।
এ প্রসঙ্গে ডান হাতে পানি পান করা এবং থেমে থেমে পানি পান করার বিষয়টি ভুলে গেলে চলবে না। কেননা সকল কাজ ডান দিক থেকে করা সুন্নাত।


নিদ্রাঃ

রাসূলুল্লাহ (সা) ডান কাত হয়ে শুতেন। তাঁর ডান হাত রাখতেন ডান গালের নিচে। সাহাবীদেরকেও এভাবেই শুতে বলতেন।

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ডান কাতে শোয়াই অধিক স্বাস্থ্যসম্মত। এতে হৃদপিন্ডের ওপর চাপ পড়ে কম। পেটের ভেতর ভারী যকৃৎ ঝুলে থাকে না। ফলে পাকস্থলীর ওপর চাপ পড়ে না। পাকস্থলীর স্বাভাবিক নড়াচড়া ঠিক থাকে এবং পাকস্থলীর ভেতরের খাদ্যদ্রব্য হজমের উপযোগী হয়ে সহজেই খাদ্যনালীর পরবর্তী অংশে চলে যেতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞান যখন ততটা উন্নত ছিল না, সেই সময়ে আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ শ’ বছর আগে নবী করীম (সা) এসব স্বাস্থ্যকর বিষয় চর্চা করে আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়েছেন।


মিসওয়াকঃ

রসুলের (সঃ) আদর্শের একটি হলো ‘মিসওয়াক’! এটি সুন্নত।
পাঁচটি সময়ে মিসওয়াক করা উত্তম:
(১) দাঁত যখন পান্ডবর্ণ হয়ে মুখে দুর্গন্ধ আসে।
(২) নিদ্রা থেকে জাগ্রত হওয়ার পর।
(৩) প্রত্যেক নামাজের প্রস্তুত প্রাক্বালে।
(৪) অজুর প্রারম্ভে।
(৫) মিথ্যা কথা বা গিবত করার পর!

মিসওয়াকের উপকারীতা : মিসওয়াক সম্পর্কে উলামাগন হাদীসের আলোকে ৭০টি উপকার বর্ণনা করেছেন-
(১) আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ হয়।
(২) এক রাকাত নামাজের সওয়াব ৭০ বা তার বেশি গুণ বর্ধিত হয়।
(৩) পাবন্দির সহিত মিসওয়াক করলে আর্তিক স্বচ্ছলতা লাভ হয।
(৪) ঐশ্বর্য্যশালী হওয়া যায়।
(৫) সহজে রিজিক লাভ হয়।
(৬) মুখ সুগন্ধময় হয়।
(৭) মাড়ি শক্ত করে।
(৮) মাথা ব্যথা দুর করে।
(৯) মাথার শিরা গুলি সংযত রাখে।
(১০) মাথা ধরা বন্ধ করে।
(১১) কফ দুর করে।
(১২) দন্ত মজবুত থাকে।
(১৩) কণ্ঠনালী ময়লা মুক্ত রাখে।
(১৪) পাকস্থলী কর্মময় রাখে।
(১৫) বাকশক্তি বৃদ্ধি করে।
(১৭) স্মরণ শক্তি বর্ধিত করে।
(১৮) বুদ্ধির উৎকর্ষ সাধন করে।
(১৯) অন্তর পবিত্র রাখে।
(২০) সৎকাজে উৎসাহ জন্মায়।
(২১) পারিবারিক জীবন সুখময় হবে।
(২২) চেহারা উজ্জ্বল হয়।
(২৩) ফেরেশতা গণ মুসাফাহা করেন।
(২৪) মিসওয়াকের পর নামাজের উদ্দেশ্যে বাহির হলে ফেরেশতারা অভিবাদন জানান।
(২৫) মসজিদ থেকে বের হলে আরশ ধারণ ও বহন কারী ফেরেশতারা তার জন্য ইস্তেগফার করেন।
(২৬) নবীগন ইস্তেগফার করেন।
(২৭) রসুল গণ ইস্তেগফার করেন,
(২৮) শয়তান অসন্তুষ্ঠ ও লজ্জিত হয়।
(২৯) শয়তান বিতাড়িত হয়।
(৩০) মেধা শক্তিকে উজ্জ্বল ও পরিষ্কার রাখে।
(৩১) ভূক্ত দ্রব্য পরিপাক করে।
(৩২) সন্তানাদি বৃদ্ধি করে।
(৩৩) বিদ্যুৎ চমকের মত পুলসিরাত অতিক্রম করা যায়।
(৩৪) হায়াত বৃদ্ধি করে।
(৩৫) আমল নামা ডান হাতে দেওয়া হবে।
(৩৬) ইবাদতের জন্য শরীরকে শক্তিশালী করে।
(৩৭) কোরআন পাঠের পথ সহজে করে।
(৩৮) শরীরের বেদনা দুরকরে।
(৩৯) মেরুদন্ড শক্ত করে।
(৪০) মৃত্যু সহজে হয়।
(৪১) দ্রুত রুহ বের হয়।
(৪২) দাঁত চকমকে রাখে।
(৪৩) মুখ সুবাসিত করে।
(৪৪) চরিত্র মধুর করে।
(৪৫) জিহবা সংযত রাখে।
(৪৬) বোধ গম্যতা প্রখর হয়।
(৪৭) মৃত্যু কালে কালেমায়ে শাহাদাত নসীব হয়।
(৪৮) দৃষ্টি শক্তি সতেজ হয়।
(৪৯) সওয়াব দ্বিগুন করে।
(৫০) মাল সম্পদ বর্ধিত করে।
(৫১) উদ্দেশ্য সিদ্ধিত সহায়ক হয়।
(৫২) কবর প্রশস্ত হয়।
(৫৩) কবরে নির্ভীক থাকা যায়।
(৫৪) মিসওয়াক, যে করে না তার রতি সওয়াব মিসওয়াক কারীকে দেওয়া হয়।
(৫৫) বেহেশতের দরজা গুলি তার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
(৫৬) দোযখের দরজা তার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হবে।
(৫৭) ফেরেশতারা বলেন, মিসওয়াক কারী নবীর অনুসারী
(৫৮) মিসওয়াক ক্বারী প্রত্যেহ নবী চরিত্র কুড়িয়ে গ্রহণ করতেছে।
(৫৯) দুনিয়া থেকে পবিত্র অবস্থায় বিদায় নিবে।
(৬০) তার রুহ কবজের সময় ফেরেশতা গণ ঐ সুরতে আসবেন যে সুরতে নবী ও রাসূল ও অলীদের নিকট আসেন .


মিসওয়াক ব্যবহার করার নিয়মঃ হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে হুজুর (সঃ) বলেন যখন তোমরা মিসওয়াক করবে তখন প্রস্থ দিয়ে করবে অর্থাৎ ডানহাত দ্বারা মিসওয়াক করা দন্তে মাড়ির দিক থেকে না মাঝিয়ে প্রস্থ দিয়ে মাজা, তার সাথে জিহবাকেও মাজা উত্তম।
হঠাৎ যদি মিসওয়াক ভুলে যায় অথবা সাথে না থাকে তাহলে ডান হাতের আঙ্গুলী দিয়ে মাজলে মিসওয়াকের সুন্নত আদায় হয়ে যাবে।


মধুঃ

মধু একটি খুব উপকারী খাদ্য, পথ্য ও ঔষধ।প্রাচীনকাল থেকে মানুষ প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে,মিষ্টি হিসেবে, চিকিৎসা ও সৌন্দর্যচর্চাসহ নানাভাবে মধুর ব্যবহার করে আসছে। শরীরের সুস্থতায় মধুর উপকারিতা অনেক।

আল কোরআনে আছে-" আপনার পালনকর্তা মৌমাছিকে আদেশ দিলেন: পর্বতে, গাছে ও উঁচু চালে বাড়ি তৈরী কর,এরপর সর্বপ্রকার ফল থেকে খাও এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথে চলো। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। "(সূরা নাহলের ৬৮ ও ৬৯ নম্বর আয়াত)

মধুর ব্যাবহার
আধুনিক চিকিত্সাবিদ্যার জনক নামে পরিচিত হিপ্পোক্রেটস শরীরের প্রদাহ ও সিফিলিস রোগের চিকিত্সায় মধু ব্যবহার করতেন বলে কথিত আছে। ২ হাজার বছর আগেও যখন চিকিত্সা বিজ্ঞান আজকের মতো এতটা উন্নত ছিল না, তখনও মানুষ জানত মধুর কী গুণ! গ্রিক অ্যাথলেটরা অলিম্পিকে অংশগ্রহণের আগে প্রচুর পরিমাণ মধু সেবন করত শক্তি বাড়ানোর জন্য। তাদের ধারণা ছিল, মধু খেলে তাদের পারফরমেন্সের উন্নতি হবে।কারণ মধুতে রয়েছে উচ্চমাত্রার ফ্রুক্টোজ ও গ্লুকোজ যা যকৃতে গ্রাইকোজেনের রিজার্ভ গড়ে তোলে।

শক্তি প্রদায়ী -
মধু ভালো শক্তি প্রদায়ী খাদ্য। মধু তাপ ও শক্তির ভালো উৎস। মধু দেহে তাপ ও শক্তি জুগিয়ে শরীরকে সুস্থ রাখে।

হজমে সহায়তা-
এতে যে শর্করা থাকে তা সহজেই হজম হয়। কারণ এতে যে ডেক্সট্রিন থাকে তা সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে ক্রিয়া করে।পেটরোগা মানুষদের জন্য মধু বিশেষ উপকারি।

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে-
মধুতে রয়েছে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।[১ চা চামচ খাঁটি মধু ভোরবেলা পান করলে কোষ্ঠবদ্ধতা এবং অম্লত্ব দূর হয়। ]

রক্তশূন্যতায়-
মধু রক্তের হিমোগ্লোবিন গঠনে সহায়তা করে বলে এটি রক্তশূন্যতায় বেশ ফলদায়ক।কারণ এতে থাকে খুব বেশি পরিমাণে কপার, লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজ।

ফুসফুসের যাবতীয় রোগ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে -
বলা হয়, ফুসফুসের যাবতীয় রোগে মধু উপকারী। যদি একজন অ্যাজমা (শ্বাসকষ্ট) রোগীর নাকের কাছে ধরে শ্বাস টেনে নেয়া হয় তাহলে সে স্বাভাবিক এবং গভীরভাবে শ্বাস টেনে নিতে পারবেন। কেউ কেউ মনে করেন, এক বছরের পুরনো মধু শ্বাসকষ্টের রোগীদের জন্য বেশ ভালো।

অনিদ্রায় -
মধু অনিদ্রার ভালো ওষুধ। রাতে শোয়ার আগে এক গ্লাস পানির সঙ্গে দুই চা চামচ মধু মিশিয়ে খেলে এটি গভীর ঘুম ও সম্মোহনের কাজ করে।

যৌন দুর্বলতায়-
পুরুষদের মধ্যে যাদের যৌন দুর্বলতা রয়েছে তারা যদি প্রতিদিন মধু ও ছোলা মিশিয়ে খান তাহলে বেশ উপকার পাবেন।

এছাড়া, প্রশান্তিদায়ক পানীয় হিসেবে,মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য রক্ষায়,পাকস্থলীর সুস্থতায়,দেহে তাপ উৎপাদনে,পানিশূন্যতায়,দৃষ্টিশক্তি বাড়াতে,রূপচর্চায়,ওজন কমাতে,হজমে সহায়তায়,তারুণ্য বজায় রাখতে,হাড় ও দাঁত গঠনে,রক্তশূন্যতা ও কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে,আমাশয় এবং পেটের পীড়া নিরাময়ে,হাঁপানি রোধে ,উচ্চ রক্তচাপ কমাতে,রক্ত পরিষ্কারক হিসেবে,রক্ত উৎপাদনে,রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়াতে,ব্যথা নিরাময়ে,গ্যাস্ট্রিক-আলসার থেকে মুক্তিতে মধু ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

২০০৭ সালে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যায়, সুপারবাগ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধে মধু অত্যন্ত কার্যকর।বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণে বিভিন্ন রোগ প্রায়ই দেহকে দুর্বল করে দেয়। এসব ভাইরাস প্রতিরোধে মধু খুবই কার্যকর।

জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছেযে মধুতে রয়েছে উচ্চশক্তিসম্পন্ন অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট। এই এজেন্ট শরীরের ক্ষতিকর রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে।



ঠান্ডা দূর করে মধু
মধু নিয়মিত খেলে অতিরিক্ত ঠান্ডা লাগার প্রবণতা দূর হবে। চা, কফি ও গরম দুধের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে হাঁচি, কাঁশি, জ্বর জ্বর ভাব, জ্বর, গলাব্যথায়,টনসিল, নাক দিয়ে পানি পড়া,জিহ্বার ঘা (ঠান্ডাজনিত) ভালো হয়।

সমপরিমাণ আদারস এবং মধুর মিশ্রণ কাশির সাহায্যে শ্লেষ্মা বের করে ফেলার একটি সহায়ক ওষুধ হিসেবে কাজ করে। এটি ঠান্ডা, কাশি, কণ্ঠনালির ক্ষত, নাক দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি থেকে দ্রুত পরিত্রাণ দেয়।

পেনসিলভানিয়া স্টেট কলেজ অব মেডিসিনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এক চামচ মধু বিভিন্ন সর্দির ওষুধ থেকেও অনেক বেশি কার্যকর।মধুর এই ঠাণ্ডাজনিত রোগনিরোধী গুণের কথা বলা হয়েছে এই গবেষণায়,যা কবিরাজি মতে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত।


ক্ষত সারাতে মধু
প্রাচীন কাল তেকে গ্রিস ও মিশরে ক্ষত সারাইয়ে মধু ব্যবহৃত হয়ে আসছে।আজকাল ছোটখাটো কাটাছেঁড়া সারাতেও মধুর ব্যবহারের কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা।২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. শোন ব্লেয়ার বলেছেন, ক্ষতে ইনফেকশন সৃষ্টি হওয়া প্রতিরোধ করতেও ড্রেসিংয়ের সময় মধু মেশানো উচিত। অগ্নিদগ্ধ ত্বকের জন্যও মধু খুব উপকারী।মধু ব্যাকটেরিয়ার আক্রামণকেও ঠেকায়।তাছাড়া দেহের ক্ষত এবং ফোঁড়ার ওপর মধু এবং চিনি চমৎকার কাজ করে থাকে। এটি যে কোনো ব্যথাকে প্রশমিত করে এবং জীবাণুনাশকের কাজ করে।



প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) নিয়মিত মধু খেতেন। প্রতিদিন সকালে অন্য কিছু খাওয়ার আগে এক কাপ পানিতে এক চামচ মধু মিশিয়ে পান করতেন।


কালোজিরাঃ

প্রাচীনকাল থেকে কালোজিরা মানবদেহের নানা রোগের প্রতিষেধক এবং প্রতিরোধক হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

প্রায় ১৪শ’ বছর আগে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছিলেন, ‘কালোজিরা রোগ নিরাময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তোমরা কালোজিরা ব্যবহার কর, নিশ্চয়ই প্রায় সব রোগের নিরাময় ক্ষমতা এর মধ্যে নিহিত রয়েছে।’

সে জন্য যুগ যুগ ধরে পয়গম্বরীয় ওষুধ হিসেবে সুনাম অর্জন করে আসছে।
সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম চিকিত্সা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ক্যানন অব মেডিসিন’-এ বলেছেন, ‘কালোজিরা দেহের প্রাণশক্তি বাড়ায় এবং ক্লান্তি দূর করে।’

কালোজিরাতে শতাধিক পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এর প্রধান উপাদানের মধ্যে প্রোটিন ২১ শতাংশ, শর্করা ৩৮ শতাংশ, স্নেহ ৩৫ শতাংশ। এছাড়াও রয়েছে ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ। প্রতি গ্রামে যেসব পুষ্টি উপাদান রয়েছে তা নিম্নরূপ—প্রোটিন ২০৮ মাইক্রোগ্রাম, ভিটামিন-বি ১.১৫ মাইক্রোগ্রাম, নিয়াসিন ৫৭ মাইক্রোগ্রাম, ক্যালসিয়াম ১.৮৫ মাইক্রোগ্রাম, আয়রন ১০৫ মাইক্রোগ্রাম, ফসফরাস ৫.২৬ মিলিগ্রাম, কপার ১৮ মাইক্রোগ্রাম, জিঙ্ক ৬০ মাইক্রোগ্রাম, ফোলাসিন ৬১০ আইউ

কালোজিরার গুণের শেষ নেই
— প্রতিদিন সকালে এক চিমটি কালোজিরা এক গ্লাস পানির সঙ্গে খেলে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তের গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।
— হাঁপানি রোগীদের শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় কালোজিরায় উপকার পাওয়া যায়।
— নারী-পুরুষের যৌন অক্ষমতায় নিয়মিত কালোজিরা সেবনে যৌনশক্তি বৃদ্ধি পায়।
— কালোজিরায় রয়েছে ১৫টি অ্যামাইনো এসিড। আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজন ৯টি এসেনসিয়াল অ্যামাইনো এসিড যা দেহে তৈরি হয় না, অবশ্যই খাবারের মাধ্যমে এর অভাব পূরণ করতে হয়। আর কালোজিরায় রয়েছে আটটি এসেনসিয়াল অ্যামাইনো এসিড।
— সর্দি-কাশি সারাতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
— প্রসূতি মাতাদের দুগ্ধ বাড়াতে ও নারী দেহের মাসিক নিয়মিতকরণে এবং মাসিকের ব্যথা নিবারণে কালোজিরার ভূমিকা রয়েছে।
— নিয়মিত কালোজিরা সেবনে চুলের গোড়ায় পুষ্টি ঠিকমত পায়, ফলে চুলের বৃদ্ধি ভালো হয় এবং চুল পড়া বন্ধ হয়। মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রক্ত সঞ্চালন ও বৃদ্ধি সঠিকভাবে হয় এবং সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে।


আঙ্গুরঃ

ইমাম মোহাম্মদ বাকের (আ) বলেছেন, বেহেস্তে চারটি ফল থাকবে সেগুলো হলো, আঙ্গুর, তাজা খেজুর, বেদানা এবং আপেল ।

সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উইনকোনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা আঙ্গুরে এক ধরনের লোহিত উপাদানের সন্ধান পেয়েছেন। 'রেজভারেট্রল' নামের এই রাসায়নিক উপাদান হৃৎপিণ্ড এবং রক্তনালীগুলোকে বুড়িয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। কম ক্যালোরিযুক্ত এ লোহিত উপাদান আয়ু বাড়ায় এবং বুড়িয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে কমিয়ে দেয়। এ ছাড়া, ভিটামিন এ, বি, সি ছাড়াও আঙ্গুরে রয়েছে পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, লৌহ, আয়োডিন এবং ফসফরাসের মতো খনিজ উপাদান। আঙ্গুরের ফ্রুকটোজ সহজে রক্তে প্রবেশ করতে পারে এবং একে গুরুত্বপূর্ণ শর্করা হিসেবে গণ্য করা হয়।
পবিত্র কোরআনে অন্তত ১১টি আয়াতে আঙ্গুরের উল্লেখ করা হয়েছে।


হযরত আলী (আ) আঙ্গুরকে শুধু উপকারী ফলই বলেননি একে ও পুর্ণাঙ্গ খাদ্য হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।


চিকিৎসা ও পুষ্টিবিদরা আঙ্গুর, খেজুর এবং কিশমিশকে পূর্ণাঙ্গ খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করেন। এ তিনটি খাদ্য থেকে দেহের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিন পাওয়া যায়। আঙ্গুর গোত্রীয় ফল দেহের প্রয়োজনীয় শক্তি সরবরাহ করতে পারে। তাই অল্প পরিমাণে আঙ্গুর বা কিশমিশ খেয়ে মানুষ দৈহিক ও মানসিক পরিশ্রমের জন্য প্রচুর শক্তি পেতে পারেন।
আঙ্গুর হতাশা প্রতিহত করতে সাহায্য করে। বিশেষ করে দুঃখ-বেদনা, মানসিক পীড়ন ও বিষন্নতা প্রতিহত করার ক্ষেত্রে আঙ্গুর বিশেষ ফলদায়ক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।


মহানবী হযরত মুহাম্মদ (স) বলেছেন, তোমরা কিশমিশ বা আঙ্গুর খেতে অবহেলা করো না কারণ আঙ্গুর ও কিশমিশ দেহমন ভাল রাখে ।

ইরানের বিশ্বখ্যাত ইসলামী দার্শনিক ও বিজ্ঞানী আবু আলী সিনা আঙ্গুরকে অন্ত্রের বেদনা উপশমকারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেহে টক্সিন বা অধিবিষ নামে যে সব বিষাক্ত উপাদান জন্মে তা দূর হয় আঙ্গুর খাওয়ার মাধ্যমে। এ ছাড়া, আঙ্গুর রক্ত পরিশোধনের কাজও করে। আর এ কারণে শ্রান্তি দূর হয় ও দেহ চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
আঙ্গুর উচ্চরক্ত চাপ, ডায়রিয়া ও ত্বকের সমস্যা দূর করতেও সহায়তা করে।

আঙ্গুর শুকিয়ে তৈরি হয় কিশমিশ এবং কিশমিশে ৬০ শতাংশ ফ্রুকটোজ রয়েছে। খুবানি বা কুল জাতীয় ফলে যতটা এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে কিশমিশেও প্রায় সে পরিমাণ বিজারক উপাদান থাকে। আরেকটি মজার ব্যাপার হলো, কিসমিসকে যতই শুকানো হবে ততই তার পুষ্টিমান বাড়বে। তাই কিশমিশ আঙ্গুরের চেয়ে বেশি শক্তির যোগান দিতে পারে। শ্বাসতন্ত্রের অসুখ-বিসুখসহ যকৃত, মুত্রথলি, বৃক্ক বা কিডনির নানা রোগ সারিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়তা করে কিশমিশ। বিশেষ ধরণের কিশমিশের চমৎকার সব গুণের কথা বলা হয়েছে পবিত্র হাদিসে। বীচি ছাড়া কালো ও লাল আঙ্গুর থেকে যে সব কিশমিশ তৈরি হয় সে প্রসঙ্গে কথা বলেছেন নবী হযরত মুহাম্মদ (স)।


হাদিসে বলা হয়েছে, সকালে নাস্তার আগে খালি পেটে বীচি ছাড়া আঙ্গুর হতে তৈরি ২১টি কিশমিশ খেলে শারীরিক দুর্বলতা এবং আল জাইমার (Alzheimer’s disease)রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায় ।

সাম্প্রতিক জরীপেও এর সত্যতা খুঁজে পাওয়া গেছে। বৃটেন থেকে প্রকাশিত 'কেমেস্ট্রি অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি' নামের সাময়িকীতে বলা হয়েছে, কিশমিশে এমন কিছু শক্তিশালী উপাদান আছে যা আলজাইমার রোগ(Alzheimer’s disease) প্রতিহত করতে সহায়তা করে। গবেষণাগারের পরীক্ষায় দেখা গেছে, কিশমিশের অ্যান্টো-সিয়ানিন এবং পলি-ফেনোলিক উপাদানসহ আরো কিছু উপাদান আছে যা আলজাইমার সারিয়ে তোলার ক্ষেত্রে সহায়তা করে। এ ছাড়া, এ জাতীয় কিশমিশে ওমেগা থ্রি, ওমেগা সিক্স, ফ্যাটি এসিড এবং ভিটামিন ই পাওয়া যায়।
ইরানের চিকিৎসা বিষয়ক ওয়েব সাইটে প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, বীচিবিহীন আঙ্গুর থেকে তৈরি কিশমিশে ক্যান্সার প্রতিরোধ করার ক্ষমতা আছে । শুধু তাই না কোনো কোনো ক্যান্সার এবং হৃদরোগ সারিয়ে তুলতে সাহায্য করে এ ধরনের কিশমিশ। এ জাতীয় কিশমিশ রক্তনালীগুলোকে ফ্রি রেডিক্যাল থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে এবং রক্তনালীগুলোর কোমলতা বজায় রাখে।


যায়তুনঃ

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা পাজরের ব্যাথা জনিত রোগে কুস্তেবহরী এবং যায়তুন তৈল দ্বারা চিকিৎসা নাও। ( ইবনে মাজাই,আহমদ ও হাকেম)

প্রাচীন এবং আধুনিক চিকিৎসকগণ যায়তুন তেলের অশেষ প্রশংসা করেছেন এবং এটিকে ত্বক ও সতেজকারী হিসেবে সকলেই মেনে নিয়েছেন। থান্ডা জনিত ব্যাথা, দুর্বল শিশু ও অঙ্গ প্রত্তাঙ্গের শক্তি বর্ধনে এ তেল খুবই উপকারী। যায়তুনের তেল কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে,হাতের পাঞ্জা প্রশস্ত করে এবং ব্যাথা উপশম করে।

রোগ প্রতিরোধঃ

কিভাবে রোগ প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, তা তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন আজ থেকে প্রায় চৌদ্দ শ’ বছর আগে, যখন চিকিৎসাবিজ্ঞান ততটা উন্নত ছিল না।
উদাহরণ¯¦রূপ উল্লেখ করা যায়, হাই তোলার সময় তিনি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দিতে বলেছেন (সহীহ বুখারি)। হাই তোলা মানুষের একটি সাধারণ শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার। হাই তোলার সময় আমরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস টানি। আর এই দীর্ঘ নিঃশ্বাসের সাথে বাতাস থেকে হাজারো জীবাণু মুখে প্রবেশ করতে পারে। জীবাণু যাতে মুখে প্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য নবী করিম (সা) হাই তোলার সময় হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দিতে বলেছেন।

দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে অজু করতে হয়। অজু কিভাবে করতে হবে, শরীরের কোন্ কোন্ অঙ্গ ধুতে হবে, মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে সেই নির্দেশ দিয়েছেন,
“তোমরা যখন নামাজের জন্য দন্ডায়মান হবে, তখন তোমরা তোমাদের মুখমন্ডল ও দু’হাত কনুইসহ ধৌত করবে। তারপর মাথা মাসেহ করবে, আর দু’পা গিরা পর্যন্ত ধুবে।” (সূরা মায়েদা, আয়াত ৬)
নিয়মিত হাত ধোয়ার মাধ্যমে অনেক রোগ প্রতিরোধ করা যায় বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে প্রমাণিত। অজুর মাধ্যমে হাত ধোয়ার পর খুব কম জীবাণুই হাতে লেগে থাকতে পারে। তাই নিজের ও অন্যের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কাও কমে যায়।

খোলা পানীয় ও খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
রাসূলুল্লাহ (সা) খাদ্যদ্রব্য ও পানীয় ঢেকে রাখতে বলেছেন। (সহীহ বুখারি)
খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার কথাও বলেছেন তিনি। (সহীহ বুখারি)
সুস্থ থাকার জন্য নবী করীম (সা)-এর আদর্শকে আমাদের অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
হাদীসে রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন,‘পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ"।


চিকিৎসাঃ

ইসলামের দৃষ্টিতে চিকিৎসা হলো তিন ধরনের -
১• যা মুখে গ্রহণ করা যায় (সিরাপ, ট্যাবলেট, ক্যাপসুল ইত্যাদি),
২• কাটা-ছেঁড়া করা (সিঙ্গা লাগানো, অস্ত্রোপচার),
৩• আগুনের ছ্যাঁকা(ফিজিওথেরাপী)।
তবে আল্লাহর নাম বলে ফুঁক করার কথাও হাদীস দ্বারা প্রমাণ পাওয়া যায়। তাবীজের ব্যাপারে দু’ধরনের বক্তব্যই রয়েছে। তবে বর্তমানে তাবীজের যে অপপ্রয়োগ ও অন্যায্যতা চলছে। ফলে এর না জায়েজের দিকটিই প্রাবল্য।


""হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় চাই ধবল রোগ থেকে, পাগল হওয়া থেকে, কুষ্ঠ রোগ থেকে এবং দূরোরোগ্য ব্যাধি থেকে"। (আবু দাউদ শরীফ, হাদীস-১৩২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ! তোমরা চিকিৎসা করো। কারণ যিনি রোগ দিয়েছেন, তিনি তার প্রতিকারের জন্য ওষুধের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।’

এক ব্যক্তি মহানবী (সা.)-কে প্রশ্ন করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা রোগ হলে চিকিৎসা করি, তা কি তাকদির পরিপন্থী নয়?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘না, চিকিৎসা গ্রহণ করাই হলো তাকদির।’



জ্বর সম্পর্কে রাসূল (সাঃ)-এর ব্যবস্থাপত্র হচ্ছে, ‘জ্বর মূলত দোযখের উত্তাপ থেকে সৃষ্ট, সুতরাং তোমরা তা পানি দ্বারা ঠাণ্ডা কর।’

চৌদ্দশতাধিক বছর পূর্বে প্রিয়নবী (সাঃ)-এর শেখানো পানি দ্বারা জ্বরের চিকিৎসার বিষয়টিকেই অকপটে মেনে নিলেন বর্তমান বিজ্ঞানীরা। জ্বরের জন্য তারা যেসব ব্যবস্থা দিয়ে থাকেন তার মধ্যে পানিই হচ্ছে প্রধান।

হযরত আনাস(রাঃ) হতে বর্ণিত,"চারটি বস্তুকে চারটি কারনে ক্ষতিকর মনে করবেনা।
১।চোঁখ ওঠাকে ক্ষতিকর মনে কর না,কেননা উহা অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করে।
২।কফ সর্দিকে খারাপ মনে করবেনা,কেননা এটা কুষ্ঠরোগের মূলোৎপাটনকারী।
৩।কাশিকে অকল্যাণকর ভেবনা- কেননা উহা অর্ধবিকলংগতার শিকড় কেটে দেয়।
৪।দমল (এক ধরনের ফোড়া)-কে খারাপ মনে করনা কেননা উহা শ্বেত ও কুষ্ঠরোগের উৎপত্তিতে বাধা দেয়"।( নুজহাতুল মাজলিস)


পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে, “বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চাও, তবে আমাকে অনুসরণ করো। তাহলে আল্লাহও তোমাদেরকে ভালোবাসবেন।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৩১)।


আল্লাহতা'লা আমাদেরকে রাসুলুল্লাহ (সা.) এর দেখানো পথে জীবনযাপন করার তওফীক দান করুন।আমীন।
void(1);
বিঃদ্রঃ
১।অনিচ্ছাকৃত ভুল থাকলে অনুগ্রহ করে জানাবেন।
২।চিকিৎসাসংক্রান্ত আরো হাদীস কারো জানা থাকলে উল্লেখ করলে খুশি হব।ধন্যবাদ।

0

Monday, May 1, 2017

শূন্যস্থান থেকে স্রষ্টার দূরত্ব...


প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ

আরিফ আজাদ


সাজিদের কাছে একটি মেইল এসেছে সকালবেলা।মেইলটি পাঠিয়েছে তার নাস্তিক বন্ধু বিপ্লব ধর। বিপ্লব দা'কে আমিও চিনি। সদা হাস্য এই লোকটার সাথে মাঝে মাঝেই টি.এস.সিতে দেখা হতো।দেখা হলেই উনি একটি হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন,- 'তুই কি এখনো রাতের বেলা ভূত দেখিস?'

বিপ্লব দা মনে হয় হাসিটি প্রস্তুত করেই রাখতো।দেখা হওয়া মাত্রই প্রদর্শন। বিপ্লব দা'কে চিনতাম সাজিদের মাধ্যমে। সাজিদ আর বিপ্লব দা একই ডিপার্টমেণ্টের। বিপ্লব দা সাজিদের চেয়ে দু ব্যাচ সিনিয়র।

সাজিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যে প্রথমে নাস্তিক হয়ে গিয়েছিলো, তার পুরো ক্রেডিটটাই বিপ্লব দা'র। বিপ্লব দা তাকে বিভিন্ন নাস্তিক, এ্যাগনোষ্টিকদের বই-টই পড়িয়ে নাস্তিক বানিয়ে ফেলেছিলো। সাজিদ এখন আর নাস্তিক নেই।

আমি ক্লাশ শেষে রুমে ঢুকে দেখলাম সাজিদ বরাবরের মতোই কম্পিউটার গুতাচ্ছে।আমাকে দেখামাত্রই বললো,- 'তোর দাওয়াত আছে।'

- 'কোথায়?'- আমি জিজ্ঞেস করলাম।

সাজিদ বললো,- 'বিপ্লব দা দেখা করতে বলেছেন।'

আমার সাথে উনার কোন লেনদেন নেই।আমাকে এভাবে দেখা করতে বলার হেতু কি বুঝলাম না।সাজিদ বললো,- 'ঘাবড়ে গেলি নাকি? তোকে একা না, সাথে আমাকেও।'

এই বলে সাজিদ বিপ্লব দা'র মেইলটি ওপেন করে দেখালো।মেইলটি হুবহু এরকম-

'সাজিদ,

আমি তোমাকে একজন প্রগতিশীল, উদারমন সম্পন্ন, মুক্তোমনা ভাবতাম।পড়াশুনা করে তুমি কথিত ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অন্ধ বিশ্বাস থেকে বেরিয়ে এসেছিলে।কিন্তু তুমি যে আবার সেই অন্ধ বিশ্বাসের জগতে ফিরে যাবে- সেটা কল্পনাও করিনি আমি।আজ বিকেলে বাসায় এসো। তোমার সাথে আলাপ আছে।'

আমরা খাওয়া-দাওয়া করে, দুপুরের নামাজ পড়ে বিপ্লব দা'র সাথে দেখা করার জন্য বের হলাম।বিপ্লব দা আগে থাকতেন বনানী, এখন থাকেন কাঁটাবন। জ্যাম-ট্যাম কাটিয়ে আমরা যখন বিপ্লব দা'র বাসায় পৌঁছি, তখন আসরের ওয়াক্ত হয়ে গেছে।বিপ্লব দা'র সাথে হ্যান্ডশেক করে আমরা বসলাম না। সাজিদ বললো,- 'দাদা, আলাপ একটু পরে হবে। আসরের নামাজটা পড়ে আসি আগে।'

বিপ্লব দা না করলেন না।আমরা বেরিয়ে গেলাম।পার্শ্ববর্তী মসজিদে আসরের নামাজ পড়ে ব্যাক করলাম উনার বাসায়।

বিপ্লব দা ইতোমধ্যেই কফি তৈরি করে রেখেছেন।খুবই উন্নতমানের কফি।কফির গন্ধটা পুরো ঘরময় ছড়িয়ে পড়লো মূহুর্তেই।

সাজিদ কফি হাতে নিতে নিতে আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো,- 'জানিস, বিপ্লব দা'র এই কফি বিশ্ববিখ্যাত।ভূ-মধ্য সাগরীয় অঞ্চলের কফি।এইটা কানাডা ছাড়া আর কোথাও পাওয়া যায় না। বিপ্লব দা কানাডা থেকে অর্ডার করিয়ে আনেন।'

কফির কাপে চুমুক দিয়ে মনে হলো আসলেই সত্যি।এত ভালো কফি হতে পারে-ভাবাই যায় না।

সাজিদ এবার বিপ্লব দা'র দিকে তাকিয়ে বললো,- 'আলাপ শুরু হোক।'

বিপ্লব দা'র মুখে সদা হাস্য ভাবটা আজকে নেই। উনার পরম শিষ্যের এরকম অধঃপতনে সম্ভবত উনার মন কিছুটা বিষন্ন। তিনি বললেন,- 'তোমার সিদ্ধান্তের প্রতি আমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা আছে। তবে, তোমাকে একটি বিষয়ে বলার জন্যই আসতে বলেছি। হয়তো তুমি ব্যাপারটি জেনে থাকবে-তবুও।'

সাজিদ কফির কাপে চুমুক দিয়ে বললো,- 'জানা বিষয়টাও আপনার মুখ থেকে শুনলে মনে হয় নতুন জানছি। আমি আপনাকে কতোটা পছন্দ করি তা তো আপনি জানেনই।'

বিপ্লব দা কোন ভূমিকায় গেলেন না।সরাসরি বললেন,- 'ওই যে, তোমার সৃষ্টিকর্তা, উনার ব্যাপারে বলতে চাই। তুমি বিজ্ঞানের ছাত্র, তুমি হয়তো এ ব্যাপারে জানো। সম্প্রতি বিজ্ঞান প্রমান করেছে, এই মহাবিশ্ব সৃষ্টিতে সৃষ্টিকর্তার কোন দরকার নেই।মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে শুন্য থেকেই।আগে তোমরা, মানে বিশ্বাসীরা বলতে, একটা সামান্য সুঁচও যখন কোন কারিগর ছাড়া এমনি এমনি তৈরি হতে পারেনা, তাহলে এই গোটা মহাবিশ্ব কিভাবে তৈরি হবে আপনাআপনি? কিন্তু বিজ্ঞান এখন বলছে, এই মহাবিশ্ব শুন্য থেকে আপনাআপনিই তৈরি হয়েছে।কারো সাহায্য ছাড়াই।'

এই কথাগুলো বিপ্লব দা এক নাগাড়ে বলে গেলেন।মনে হয়েছে তিনি কোন নিঃশ্বাসই নেন নি এতক্ষণ।

সাজিদ বললো,- 'অদ্ভুত তো। তাহলে তো আমাকে আবার নাস্তিক হয়ে যেতে হবে দেখছি। হা হা হা হা।'

সাজিদ চমৎকার একটা হাসি দিলো। সাজিদ এইভাবে হাসতে পারে, তা আমি আজই প্রথম দেখলাম। বিপ্লব দা সেদিকে মনোযোগ দিয়েছেন বলে মনে হলো না। উনি মোটামুটি একটা লেকচার শুরু করেছেন।আমি আর সাজিদ খুব মনোযোগি ছাত্রের মতো উনার বৈজ্ঞানিক কথাবার্তা শুনছিলাম। তিনি যা বোঝালেন, বা বললেন, তার সার সংক্ষেপ এরকম।-

'পদার্থ বিজ্ঞানে নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে কোয়াণ্টাম মেকানিক্স। এই কোয়ান্টাম মেকানিক্সে একটি থিওরি আছে, সেটি হলো- 'কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশান। এই কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশানের মূল কথা হলো,- 'মহাবিশ্বে পরম শুন্য স্থান বলে আদতে কিছু নেই। মানে, আমরা যেটাকে 'Nothing' বলে এতদিন জেনে এসেছি, বিজ্ঞান বলছে, আদতে 'Nothing' বলতে কিছুই নেই।প্রকৃতি শূন্য স্থান পছন্দ করেনা। তাই, যখনই কোন শুন্যস্থান (Nothing) তৈরি হয়, সেখানে এক সেকেন্ডের বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ সময়ের মধ্যে কণা এবং প্রতিকণা (Matter & anti-matter) তৈরি হচ্ছে, এবং একটির সাথে অন্যটির ঘর্ষণে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

তোমরা জানো কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশানের ধারনা কোথা হতে এসেছে?'

আমি বললাম,- 'না।'

বিপ্লব দা আবার বলতে শুরু করলেন,- ' এই ধারনা এসেছে হাইজেনবার্গের বিখ্যাত 'অনিশ্চয়তা নীতি' থেকে। হাইজেনবার্গের সেই বিখ্যাত সূত্রটা তোমরা জানো নিশ্চয়?'

সাজিদ বললো,- 'হ্যাঁ। হাইজেনবার্গ বলেছেন, আমরা কখনও একটি কণার অবস্থান এবং এর ভরবেগের সঠিক পরিমাণ একসাথে একুরেইটলি জানতে পারবো না। যদি অবস্থান সঠিকভাবে জানতে পারি, তাহলে এর ভরবেগের মধ্যে গলদ থাকবে।আবার যদি ভরবেগ সঠিকভাবে জানতে পারি, তাহলে এর অবস্থানের মধ্যে গলদ থাকবে।দুটো একইসাথে সঠিকভাবে জানা কখনোই সম্ভব না। এইটা যে সম্ভব না, এটা বিজ্ঞানের অসারতা না, আসলে এটা হলো কণার ধর্ম বা বৈশিষ্ট্য। '

বিপ্লব দা বললেন,- 'এক্সাক্টলি। একদম তাই।হাইজেনবার্গের এই নীতিকে শক্তি আর সময়ের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়।হাইজেনবার্গের এই নীতি যদি সত্যি হয়, তাহলে মহাবিশ্বে 'শূন্যস্থান' বলে কিছু থাকতে পারেনা। যদি থাকে, তাহলে তার অবস্থান ও ভরবেগ দুটোই শূন্য চলে আসে, যা হাইজেনবার্গের নীতি বিরুদ্ধ।'

এইটুকু বলে বিপ্লব দা একটু থামলো। কফির পট থেকে কফি ঢালতে ঢালতে বললেন,- 'বুঝতেছো তোমরা?'

সাজিদ বুঝছে কিনা জানিনা, তবে আমার কাছে ব্যাপারটি দূর্বোধ্য মনে হলেও, বিপ্লব দা'র উপস্থাপন ভঙ্গিমা সেটাকে অনেকটাই প্রাঞ্জল করে তুলছে।ভালো লাগছে।

বিপ্লব দা কফিতে চুমুক দিলেন। এরপর আবার বলতে শুরু করলেন,- 'তাহলে তোমরা বলো না, যে বিগ ব্যাং এর আগে তো কিছুই ছিলো না।না সময়, না শক্তি, না অন্যকিছু।তাহলে বিগ ব্যাং এর বিস্ফোরনটি হলো কিভাবে? এর জন্য নিশ্চয় কোন শক্তি দরকার? কোন বাহ্যিক বল দরকার,তাই না? এইটা বলে তোমরা স্রষ্টার ধারনাকে জায়েজ করতে।তোমরা বলতে, এই বাহ্যিক বলটা এসেছে স্রষ্টার কাছ থেকে। কিন্তু দেখো, বিজ্ঞান বলছে, এইখানে স্রষ্টার কোন হাত নেই। বিগ ব্যাং হবার জন্য যে শক্তি দরকার ছিলো, সেটা এসেছে এই কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশান থেকে।সুতরাং, মহাবিশ্ব তৈরিতে স্রষ্টার অস্তিত্বকে বিজ্ঞান ডাইরেক্ট 'না' বলে দিয়েছে।আর, তোমরা এখনো স্রষ্টা স্রষ্টা করে কোথায় যে পড়ে আছো।'

এতটুকু বলে বিপ্লব দা'র চোখমুখ ঝলমলিয়ে উঠলো। মনে হচ্ছে, উনি যে উদ্দেশ্যে আমাদের ডেকেছেন তা সফল হয়ে গেছে। আমরা হয়তো উনার বিজ্ঞানের উপর এই জ্ঞানগর্ভ লেকচার শুনে এক্ষুনি নাস্তিকতার উপর ঈমান নিয়ে আসবো।

যাহোক, ইতোমধ্যে সাজিদ দু কাপ কফি গিলে ফেলেছে। নতুন এক কাপ ঢালতে ঢালতে সে বললো,- 'এই ব্যাপারে ষ্টিফেন হকিংয়ের বই আছে।নাম- 'The grand design'। এটা আমি পড়েছি।'

সাজিদের কথা শুনে বিপ্লব দা'কে খুব খুশি মনে হলো।তিনি বললেন,- 'বাহ, তুমি তাহলে পড়াশুনা ষ্টপ করোনি? বেশ বেশ! পড়াশুনা করবে।বেশি বেশি পড়বে।'

সাজিদ হাসলো। হেসে সে বললো, - 'কিন্তু দাদা, এই ব্যাপারে আমার কনফিউশান আছে।'

- 'কোন ব্যাপারে?'- বিপ্লব দা'র প্রশ্ন।

- 'ষ্টিফেন হকিং আর লিওনার্ড ম্লোদিনোর বই The grand design এর ব্যাপারে।'

বিপ্লব দা একটু থতমত খেলো মনে হলো। মনে হয় উনি মনে মনে বলছে- এই ছেলে দেখছি খোদার উপর খোদাগিরি করছে।

তিনি বললেন,- 'ক্লিয়ার করো।'

সাজিদ বললো,- আমি দুইটা দিক থেকেই এটার ব্যাখ্যা করবো।বিজ্ঞান এবং ধর্ম। যদি অনুমতি দেন।'

- 'অবশ্যই।'- বিপ্লব দা বললেন।

আমি মুগ্ধ শ্রোতা। গুরু এবং এক্স-শিষ্যের তর্ক জমে উঠেছে।

সাজিদ বললো,- 'প্রথম কথা হচ্ছে, ষ্টিফেন হকিংয়ের এই থিওরিটা এখনো 'থিওরি', সেটা 'ফ্যাক্ট' নয়।এই ব্যাপারে প্রথম কথা বলেন বিজ্ঞানি লরেন্স ক্রাউস।তিনি এইটা নিয়ে একটি বিশাল সাইজের বই লিখেছিলেন।বইটার নাম ছিলো- 'A Universe from nothing'।

অনেক পরে, এখন ষ্টিফেন এটা নিয়ে উনার The grand design এ কথা বলেছেন। উনার এই বইটা প্রকাশ হবার পর সি এন এনের এক সাংবাদিক হকিংকে জিজ্ঞেস করেছিলো,- 'আপনি কি ইশ্বরে বিশ্বাস করেন?'

হকিং বলেছিলো,- 'ইশ্বর থাকলেও থাকতে পারে, তবে, মহাবিশ্ব তৈরিতে তার প্রয়োজন নেই।'

বিপ্লব দা বললো,- 'সেটাই।উনি বোঝালেন যে, ইশ্বর মূলত ধার্মিকদের একটি অকার্যকর বিশ্বাস।'

- 'হকিং কি বুঝিয়েছেন জানিনা, কিন্তু হকিংয়ের অই বইটি অসম্পূর্ণ।কিছু গলদ আছে।'

বিপ্লব দা কফির কাপ রাখতে রাখতে বললেন,- 'গলদ? মানে?'

- 'দাঁড়ান, বলছি। গলদ মানে, উনি কিছু বিষয় বইতে ক্লিয়ার করেন নি। যেহেতু এটা বিজ্ঞান মহলে প্রমানিত সত্য নয়, তাই এটা বিজ্ঞান মহলে প্রচুর বিতর্কিত হয়েছে।

উনার বইতে যে গলদগুলো আছে, সেগুলো সিরিয়ালি বলছি।

গলদ নাম্বার ০১-

হকিং বলেছেন, শূন্য থেকেই কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশানের মাধ্যমে বস্তু কণা তৈরি হয়েছে,এবং সেটা মহাকর্ষ বলের মাধ্যমে নিউট্রালাইজ হয়েছে।

এখানে প্রশ্ন হলো,- 'শূন্য বলতে হকিং কি একদম Nothing (কোনকিছুই নেই) বুঝিয়েছেন, নাকি Quantum Vaccum (বস্তুর অনুপস্থিতি) বুঝিয়েছেন সেটা ক্লিয়ার করেন নি।হকিং বলেছেন, শূন্যস্থানে বস্তু কণার মাঝে কোয়াণ্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশান হতে হলে সেখানে মহাকর্ষ বল প্রয়োজন। কিন্তু অই শূন্যস্থানে (যখন সময় আর স্থানও তৈরি হয়নি) ঠিক কোথা থেকে এবং কিভাবে মহাকর্ষ বল এলো, তার কোন ব্যাখ্যা হকিং দেয় নি।

গলদ নাম্বার- ০২

হকিং তার বইতে বলেছেন, মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে একদম শূন্য থেকে, কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশানের মাধ্যমে। তখন 'সময়' (Time) এর আচরন আজকের সময়ের মতো ছিলো না। তখন সময়ের আচরন ছিলো 'স্থান' (Space) এর মতো। কারন, এই ফ্ল্যাকচুয়েশান হবার জন্য প্রাথমিকভাবে সময়ের দরকার ছিলো না, স্থানের দরকার ছিলো।কিন্তু হকিং তার বইতে এই কথা বলেন নি যে,যে সময় (Time) মহাবিশ্বের একদম শুরুতে 'স্থান' এর মতো আচরন করেছে, সেই 'সময়' পরবর্তীতে ঠিক কবে আর কখন থেকে আবার Time এর মতো আচরন শুরু করলো এবং কেনো?'

আমি বিপ্লব দা'র মুখের দিকে তাকালাম। তার চেহারার উৎফুল্ল ভাবটা চলে গেছে।

সাজিদ বলে যাচ্ছে-

গলদ নাম্বার- ০৩

পদার্থবিদ্যার যে সূত্র মেনে কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশান হয়ে মহাবিশ্ব তৈরি হলো, তখন শূন্যাবস্থায় পদার্থবিদ্যার এই সূত্রগুলো বলবৎ থাকে কি করে? এইটার ব্যাখ্যা হকিং দেয়নি।

গলদ নাম্বার - ০৪

আপনি বলেছেন, প্রকৃতি শূন্যস্থান পছন্দ করেনা। তাই, শূন্যস্থান পূরণ করতে আপনা আপনি কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশান হয়ে মহাবিশ্ব তৈরি হয়েছে। আমার প্রশ্ন হলো- যেখানে আপনি শূন্যস্থান নিয়ে কথা বলছেন, যখম সময় ছিলো না,স্থান ছিলো না, তখন আপনি প্রকৃতি কোথায় পেলেন?'

সাজিদ হকিংয়ের বইয়ের পাঁচ নাম্বার গলদের কথা বলতে যাচ্ছিলো। তাকে থামিয়ে দিয়ে বিপ্লব দা বললেন,- 'ওকে ওকে। বুঝলাম। আমি বলছি না যে এই জিনিসটা একেবারে সত্যি। এটা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হবে।আলোচনা-সমালোচনা হবে।আরো পরীক্ষা-নীরিক্ষা হবে।তারপর ডিসাইড হবে যে এটা ঠিক না ভুল।'

সাজিদের কাছে বিপ্লব দা'র এরকম মৌন পরাজয় আমাকে খুব তৃপ্তি দিলো।মনে মনে বললাম,- 'ইয়েস সাজিদ, ইউ ক্যান।'

সাজিদ বললো,- 'হ্যাঁ, সে পরীক্ষা চলতে থাকুক। যদি কোনদিন এই থিওরি সত্যিও হয়ে যায়, তাহলে আমাকে ডাক দিয়েন না দাদা। কারন, আমি কোরান দিয়েই প্রমান করে দিতে পারবো।'

সাজিদের এই কথা শুনে আমার হেঁচকি উঠে গেলো। কি বলে রে? এতক্ষন যেটাকে গলদপূর্ণ বলেছে, সেটাকে আবার কোরান দিয়ে প্রমান করবে বলছে? ক্যামনে কি?'

বিপ্লব দা'ও বুঝলো না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,- 'কি রকম?'

সাজিদ হাসলো। বললো,- 'শূন্য থেকেই মহাবিশ্ব সৃষ্টির কথা আল কোরানে বলা আছে দাদা।'

আমি আরো অবাক। কি বলে এই ছেলে?

সে বললো,- 'আমি বলছি না যে কোরান কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশানের কথাই বলেছে।কোরান যার কাছ থেকে এসেছে, তিনি তার সৃষ্টি জগতের সৃষ্টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন।এখন সেটা বিগ ব্যাং আসলেও পাল্টাবে না, কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশান থিওরি আসলেও পাল্টাবে না। একই থাকবে।'

বিপ্লব দা বললো,- 'কোরানে কি আছে বললে যেন?'

- 'সূরা বাকারার ১১৭ নাম্বার আয়াতে আছে-

'যিনি আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীকে অনস্তিত্ব হতে অস্তিত্বে আনায়ন করেন (এখানে মূল শব্দ 'বাদিয়্যু'/Originator- সেখান থেকেই অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের ধারনা) এবং যখন তিনি কিছু করবার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন শুধু বলেন হও, আর তা হয়ে যায়।'

'Creator of the heavens and the earth from nothingness, He has only to say when He wills a thing, “Be,” and it is'....

দেখুন, আমি আবারো বলছি, আমি এটা বলছি না যে, আল্লাহ তা'লা এখানে কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশানের কথাই বলেছেন। তিনি তার সৃষ্টির কথা বলেছেন। তিনি 'অনস্তিত্ব' (Nothing) থেকে 'অস্তিত্বে' (Something) এ এনেছেন।এমন না যে, আল্লাহ তার হাত দিয়ে প্রথমে মহাবিশ্বের ছাদ বানালেন। তারপর তাতে সূর্য, চাঁদ, গ্যালাক্সি এগুলা একটা একটা বসিয়ে দিয়েছেন। তিনি কেবল নির্দেশ দিয়েছেন।

হকিংও একই কথা বলছে। কিন্তু তারা বলছে এটা এমনি এমনি হয়ে গেছে, শূন্য থেকেই। আল্লাহ বলছেন, না, এমনি হয়নি। আমি যখন নির্দেশ করেছি 'হও' (কুন), তখন তা হয়ে গেলো।

হকিং ব্যাখ্যা দিতে পারছে না এই কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশানের জন্য মহাকর্ষ বল কোথা থেকে এলো, 'সময়' কেন, কিভাবে 'স্থান 'হলো, পরে আবার সেটা 'সময়' হলো।

কিন্তু আমাদের স্রষ্টা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন 'হতে', আর তা হয়ে গেলো।

ধরুন একটা ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক দেখাচ্ছে। ম্যাজিশিয়ান বসে আছে ষ্টেজের এক কোণায়।কিন্তু সে তার চোখের ইশারায় ম্যাজিক দেখাচ্ছে।দর্শক দেখছে, খালি টেবিলের উপরে হঠাৎ একটা কবুতর তৈরি হয়ে গেল,এবং সেটা উড়েও গেলো।

দর্শক কি বলবে এটা কোয়ান্টাম ফ্ল্যাকচুয়েশানের মাধ্যমে হয়ে গেছে? না, বলবে না।

এর পেছনে ম্যাজিশিয়ানের কারসাজি আছে।সে ষ্টেজের এক কোণা থেকে চোখ দিয়ে ইশারা করেছে বলেই এটা হয়েছে।

স্রষ্টাও সেরকম।তিনি শুধু বলেছেন, 'হও', আর মহাবিশ্ব আপনা আপনিই হয়ে গেলো।.....

আপনাদের সেই শূন্যস্থান থেকে স্রষ্টার দূরত্ব কেবল অই 'হও' পর্যন্তই।

মাগরিবের আজান পড়তে শুরু করেছে। বিপ্লব দা'কে অনেকটাই হতাশ দেখলাম। আমরা বললাম,- 'আজ তাহলে উঠি?'

উনি একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন,- 'এসো।'

আমরা বেরিয়ে পড়লাম। আমি অবাক হয়ে সাজিদের দিকে তাকিয়ে আছি। কে বলবে এই ছেলেটা গত ছ'মাস আগেও নাস্তিক ছিলো। নিজের গুরুকেই কি রকম কুপোকাত করে দিয়ে আসলো।কোরানের সূরা বাকারার ১১৭ নাম্বার আয়াতটি কতো হাজার বার পড়েছি, কিন্তু এভাবে কোনদিন ভাবিনি।আজকে এটা সাজিদ যখন বিপ্লব দা কে বুঝাচ্ছে, মনে হচ্ছে আজকেই নতুন শুনছি এই আয়াতের কথা। গর্ব হতে লাগলো আমার।
0